উত্তরাঞ্চলে চলমান শৈত্যপ্রবাহে পঞ্চগড়সহ আশপাশের এলাকায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। টানা শীতের কারণে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছে দরিদ্র, সুবিধাবঞ্চিত ও নিম্ন আয়ের মানুষ। প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে দৈনিক কর্মঘণ্টা কমে যাওয়ায় শ্রমজীবী বা দিনমজুরদের আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
আজ শুক্রবার অষ্টম দিনের মতো দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায়। এদিন সকাল ৯টায় তাপমাত্রা নেমে আসে ৮ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। শৈত্যপ্রবাহে মানুষের ভোগান্তি জানতে এলাকার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলেন এই প্রতিবেদক।
তেঁতুলিয়া উপজেলার বুড়াবুড়ি বালাবাড়ি গ্রামের পাথর উত্তোলনের কাজ করা শ্রমিক তাহেরুল ইসলাম ও নজিরুল ইসলাম জানান, বৈরী আবহাওয়ার কারণে তারা কাজের সময় কমাতে বাধ্য হয়েছেন।
মহানন্দা নদী থেকে পাথর উত্তোলন করে জীবিকা নির্বাহ করা শ্রমিকরা সাধারণত সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত কাজ করেন। তবে গত এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে তারা সকাল ১০টার পর নদীতে নামছেন এবং বিকেল ৩টার মধ্যেই কাজ শেষ করছেন।
সারা দিন উত্তর দিক থেকে হিমেল বাতাস বইতে থাকায় কাজ চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে, ফলে আয়ও কমে গেছে। তারা জানান, স্বাভাবিক সময়ে দিনে আট থেকে নয় ঘণ্টা কাজ করলে তাদের আয় হয় ৮০০ থেকে এক হাজার ১০০ টাকা। কিন্তু কাজের সময় কমে যাওয়ায় এখন দৈনিক আয় নেমে এসেছে প্রায় ৪০০ টাকায়।
উপজেলার আজিজনগরের রিকশাভ্যানচালক শফিকুল ইসলাম বলেন, প্রচণ্ড শীতে ভ্যান চালানো কষ্টকর হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, দিনে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা ভ্যান চালানো গেলেও ভোর ও সন্ধ্যার সময় রাস্তায় থাকা প্রায় অসম্ভব।
তেঁতুলিয়া বাজারের পান দোকানি রফিক ও রিপন জানান, গত এক সপ্তাহে তাদের দৈনিক বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। প্রয়োজন ছাড়া মানুষ ঘর থেকে বের হচ্ছে না বলেই বিক্রি কমেছে বলে তারা জানান।
জীবিকার সংকটের পাশাপাশি দীর্ঘস্থায়ী শৈত্যপ্রবাহে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে দরিদ্র মানুষ, বিশেষ করে শিশু ও বয়স্করা। তেঁতুলিয়া উপজেলার সারদারপাড়া গ্রামের ৭২ বছর বয়সী আমেনা বেওয়া বলেন, 'শীতে টিকে থাকা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে।'
তিনি বলেন, 'দিনে রোদে বসে কোনোভাবে সময় কাটানো যায়। কিন্তু রাত হলেই ঠান্ডার প্রকোপ এতোটাই বাড়ে যে রীতিমতো একটা ভীতিকর অবস্থার সম্মুখীন হতে হয়। দুই-তিনটা কম্বল আর কাঁথা গায়ে দিয়েও শরীর গরম থাকে না। শীত সহ্য করতে না পারলে ঘরের এক কোণে খড়কুটো জ্বালিয়ে আগুন ধরিয়ে শরীর গরম করি।'
শৈত্যপ্রবাহে ক্ষতিগ্রস্ত দরিদ্র মানুষের সহায়তায় সরকারী ও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা কম্বল ও শীতবস্ত্র বিতরণ করছে। তবে চাহিদার তুলনায় এসব সহায়তা অপ্রতুল।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে তেঁতুলিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আফরোজ শাহীন খসরু জানান, এরইমধ্যে তিন হাজার ৫০০টি কম্বল বিতরণ করা হয়েছে এবং আরও প্রায় ৪০০টি কম্বল বিতরণের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
অষ্টম দিনের মতো তেঁতুলিয়ায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৮ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস
আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, আগের বৃহস্পতিবার তেঁতুলিয়ায় তাপমাত্রা ছিল ৭ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, বুধবার ৮ ডিগ্রি, মঙ্গলবার ৭ দশমিক ৫ ডিগ্রি, সোমবার ৮ দশমিক ৪ ডিগ্রি, রোববার ৭ দশমিক ৩ ডিগ্রি, শনিবার ৮ দশমিক ৩ ডিগ্রি এবং আগের শুক্রবার ৬ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
তেঁতুলিয়া আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জিতেন্দ্রনাথ রায় জানান, আজ শুক্রবার বাতাসের গতি ছিল ঘণ্টায় আট থেকে ১০ কিলোমিটার এবং আর্দ্রতা ছিল ৮৯ শতাংশ।
শৈত্যপ্রবাহ অব্যাহত থাকলেও গতকাল বৃহস্পতিবার তেঁতুলিয়ায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
আবহাওয়াবিদরা জানান, হিমালয় অঞ্চল থেকে আসা শীতল বাতাস এবং প্রায় মেঘমুক্ত আকাশের কারণে পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁওসহ উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে শীতের তীব্রতা বেড়েছে। আগামী কয়েক দিন পরিস্থিতির বড় কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই।
পাশের জেলা ঠাকুরগাঁও ও দিনাজপুরেও মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। শুক্রবার ঠাকুরগাঁওয়ে তাপমাত্রা ছিল ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং দিনাজপুরে ৯ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ৮ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাকে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ, ৬ থেকে ৮ ডিগ্রিকে মাঝারি এবং ৬ ডিগ্রির নিচে তাপমাত্রাকে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ হিসেবে ধরা হয়।