আগামী ২২ জানুয়ারি থেকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণা শুরু হচ্ছে। এর আগে রিটার্নিং অফিসারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করে ৪২১ জন তাদের প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন।
১০ জানুয়ারি থেকে গতকাল রোববার পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন (ইসি) মোট ৬৪৫টি আপিলের শুনানি হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আপিলকারীর প্রার্থিতা পুনর্বহাল হয়েছে, যা আগের দুই নির্বাচনের তুলনায় বেশি।
গত রাতে শুনানি শেষে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলার সময় প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেন, ভোট যেন সুন্দরভাবে সম্পন্ন করতে পারি সেজন্য, সবার সহায়তা দরকার। কিছু কার্যক্রমে আপনারা হয়তো আমাদের সমালোচনা করতে পারেন।
স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য ছাড় দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে এক শতাংশ ভোটের বিষয়টা আমরা কীভাবে ছেড়ে দিয়েছি এটা আপনারা দেখেছেন। কারণ আমরা অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চেয়েছি। আমরা চাই যে সবার অংশগ্রহণে একটা সুন্দর নির্বাচন হোক।
অনেক ঋণখেলাপির প্রার্থিতা ফিরে পাওয়ার বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, 'আমরা ঋণখেলাপি যাদের ছাড় দিয়েছি, মনে কষ্ট নিয়ে দিয়েছি। শুধু আইন তাদের পারমিট করেছে বিধায়।'
গতকাল রিটার্নিং অফিসারদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে শুনানির শেষ দিনে ৬৩টি আপিলের শুনানি হয়। এর মধ্যে ২৩ জন আপিলকারী তাদের প্রার্থিতা ফেরত পেয়েছেন, ৩৫ জনের প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে। একটি আপিল বিচারাধীন রয়েছে। তিনটি আপিল প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং একজন আপিলকারী অনুপস্থিত ছিলেন।
গতকাল চট্টগ্রাম-৪ আসনে বিএনপির আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা আপিলে বহাল থাকে। তবে চট্টগ্রাম-২ আসনে আরেক দলীয় প্রার্থী সারওয়ার আলমগীরের মনোনয়ন বাতিল করা হয়।
আসলামের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছিল, কিন্তু তার বিরুদ্ধে ইসির কাছে আপিল করা হয়েছিল। শুনানিতে আপিল খারিজ করা হয়। ফলে রিটার্নিং অফিসারের সিদ্ধান্ত বহাল থাকে।
চট্টগ্রাম-২ আসনে সারওয়ারের মনোনয়নপত্রও প্রাথমিকভাবে বৈধ ঘোষণা করা হয়েছিল। তবে একই আসন থেকে তার প্রার্থিতা বাতিলের জন্য ইসির কাছে আপিল করেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মোহাম্মদ নুরুল আমিন।
ফেনী-৩ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আবদুল আউয়াল মিন্টুর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করেছে কমিশন। তার মনোনয়নপত্র বাতিল চেয়ে আপিল করেন একই আসনের জামায়াত প্রার্থী মোহাম্মদ ফখরুদ্দিন।
টাঙ্গাইল-৪ আসনে চারবারের সংসদ সদস্য ও সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল লতিফ সিদ্দিকী প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন। তার মনোনয়ন চ্যালেঞ্জ করেন জাতীয় পার্টির নেতা লিয়াকত আলী।
কুমিল্লা-১০ আসনে বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের প্রার্থী কাজী নুর ই আলম সিদ্দিকীর চ্যালেঞ্জের কারণে বিএনপি প্রার্থী আব্দুল গফুর ভুইয়ার প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে।
প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর আপিলের পরিপ্রেক্ষিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী সৈয়দ এ কে একরামুজ্জামানের প্রার্থিতা বাতিল করেছে ইসি।
সম্প্রতি যাচাই-বাছাইয়ের সময় মনোনয়ন বাতিল হওয়ার পর কক্সবাজার-২ আসনের জামায়াত নেতা এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ তার প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন। আপিলে প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন এনসিপি থেকে পদত্যাগ করা স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা।
কুমিল্লা-৪ আসনে এনসিপি নেতা হাসনাত আবদুল্লাহর প্রার্থিতাও বহাল রয়েছে। তার প্রার্থিতার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে বিএনপির প্রার্থী মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর করা আপিল আবেদনটি নামঞ্জুর হয়ে যায়।
হাসনাতের আপিলের পর ইসি মঞ্জুরুল আহসানের প্রার্থিতা বাতিল করে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি ঋণ খেলাপি এবং তথ্য গোপন করেছেন।
ইসি যশোর-২ আসনে বিএনপি মনোনীত সাবিরা সুলতানার প্রার্থিতাও বহাল রেখেছে।
পিরোজপুর-১ আসনে জামায়াতের প্রার্থী মাসুদ সাঈদী বিএনপি প্রার্থী আলমগীর হোসেনের বিরুদ্ধে আপিল দায়ের করেছিলেন। ইসি তা খারিজ করে দিয়েছে।
ঋণ খেলাপির অভিযোগে যশোর-৪ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী টি এস আইয়ুবের আপিলও ইসি খারিজ করে দিয়েছে। তবে একই আসন থেকে স্বতন্ত্রভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা তার ছেলে ফরহাদ সাজিদের প্রার্থিতা বহাল রয়েছে।
ঢাকা-২ আসনে জামায়াতের প্রার্থী মো. আব্দুল হক আপিলে প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন।
দ্বৈত নাগরিকত্বের কারণে চট্টগ্রাম-৯ জামায়াতের প্রার্থী একেএম ফজলুল হকের মনোনয়ন বাতিল ঘোষণা করেছে কমিশন, কারণ তার মার্কিন নাগরিকত্ব ছিল।
জাতীয় পার্টির একাংশের নেতা আনিসুল ইসলাম মাহমুদের প্রার্থিতা ইসি পুনর্বহাল করেনি।
কিশোরগঞ্জ-৫ (নিকলী-বাজিতপুর) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী এ এইচ এম কাইয়ুমের (হাসনাত কাইয়ুম) মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেছে ইসি, যদিও তার এক শতাংশ ভোটারের সই ছিল না।
আরও যারা প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন, তাদের মধ্যে রয়েছেন গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান (মাগুরা-১) এবং জামায়াতের তিন প্রার্থী মো. আব্দুল মমিন (চাঁদপুর-২), মো. মোসলেহ উদ্দিন ফরিদ (যশোর-২) ও মো. মুজিবুর রহমান আজাদী (জামালপুর-৩)।
জমা পড়া দুই হাজার ৫৬৮টি মনোনয়নপত্রের মধ্যে রিটার্নিং অফিসাররা প্রাথমিক যাচাই-বাছাইয়ে এক হাজার ৮৪২টি বৈধ বলে ঘোষণা করে এবং ৭২৩টি বাতিল করে।
সংসদ নির্বাচনের তফসিল অনুযায়ী, আপিল শুনানির পর আগামীকাল পর্যন্ত প্রার্থীদের তাদের মনোনয়ন প্রত্যাহারের সময় রয়েছে। এরপর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীর চূড়ান্ত সংখ্যা নির্ধারিত হবে।
২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে রিটার্নিং অফিসারদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করা ৫৬০ জন প্রার্থীর মধ্যে প্রায় অর্ধেক তাদের প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছিলেন। আর ২০১৮ সালের নির্বাচনে ৫৪৩ জন আপিলকারীর মধ্যে প্রার্থিতা ফিরে পান মাত্র ৩৯ শতাংশ প্রার্থী।