Tuesday, Jan 20, 2026 28°C

Concise and comprehensive global coverage.

General

পক্ষপাতের অভিযোগে চাপে নির্বাচন কমিশন

আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা শুরু হওয়ার আগে রাজনৈতিক অঙ্গন অনেকটাই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। বড় দলগুলোর দাবি, নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসন প্রার্থীদের ক্ষেত্রে নিয়ম প্রয়োগে পক্ষপাত দেখাচ্ছে।গত এক সপ্তাহে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির নেতারা নির্বাচন কমিশন, প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক এবং বিভিন্ন জনসমাবেশে বারবার এ নিয়ে তাদের উদ্বেগের কথা তুলে ধরেছেন।বিশ্লেষকদের একজন এবং একজন নির্বাচন কমিশনার বলেন, এ ধরনের অভিযোগ অনেক সময়ই একটি রাজনৈতিক কৌশলের অংশ, যা...

NP
Published: January 20, 2026, 08:04 AM
পক্ষপাতের অভিযোগে চাপে নির্বাচন কমিশন

আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা শুরু হওয়ার আগে রাজনৈতিক অঙ্গন অনেকটাই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। বড় দলগুলোর দাবি, নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসন প্রার্থীদের ক্ষেত্রে নিয়ম প্রয়োগে পক্ষপাত দেখাচ্ছে।

গত এক সপ্তাহে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির নেতারা নির্বাচন কমিশন, প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক এবং বিভিন্ন জনসমাবেশে বারবার এ নিয়ে তাদের উদ্বেগের কথা তুলে ধরেছেন।

বিশ্লেষকদের একজন এবং একজন নির্বাচন কমিশনার বলেন, এ ধরনের অভিযোগ অনেক সময়ই একটি রাজনৈতিক কৌশলের অংশ, যার উদ্দেশ্য হলো কমিশনকে কোনো দলের দিকে ঝুঁকে পড়া থেকে বিরত রাখা।

আগামী বৃহস্পতিবার থেকে প্রার্থীরা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচারে নামতে যাচ্ছেন। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এমন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের এই ক্রমবর্ধমান প্রবণতা ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়াতে পারে।

তারা জোর দিয়ে বলেন যে, নির্বাচন কমিশনকে অবশ্যই অভিযোগ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করতে হবে এবং একটি অবাধ, সুষ্ঠু এবং সর্বজনগ্রাহ্য নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য একটি স্পষ্ট, বস্তুনিষ্ঠ অবস্থান নিতে হবে।

গতকাল এনসিপি প্রতিনিধিদলের সাথে এক বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা ইউনূস বলেন, 'নির্বাচন সম্পর্কিত যেকোনো অভিযোগ ও পরামর্শ তাৎক্ষণিকভাবে সরকারকে জানাবেন। সরকারের পক্ষ থেকে যে ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া যায়, সরকার তা নেবে। কেউ যেন আইন অমান্য করতে না পারে, সে ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'

তিনি আরও বলেন, 'নিরপেক্ষতা নিশ্চিতের জন্যই লটারির মাধ্যমে মাঠ প্রশাসনে রদবদল করা হয়েছে। এ নির্বাচনে কোনো পক্ষপাতিত্বের সুযোগ নেই। এই নির্বাচন দেশের ভাগ্য নির্ধারণের নির্বাচন। এ নির্বাচন দেশ পাল্টে দেওয়ার নির্বাচন। এই নির্বাচন সুষ্ঠু হতেই হবে।'

গত রাতে দ্য ডেইলি স্টার থেকে যোগাযোগ করা হলে, নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইসির দুইজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা স্বীকার করেন যে রাজনৈতিক দলগুলোর সাম্প্রতিক মন্তব্য ও বিক্ষোভের কারণে কমিশন সত্যিই চাপের মুখে রয়েছে। এমনকি অভ্যন্তরীণ পোস্টাল ভোটিংয়ের ব্যালটেও সংশোধন আনতে হয়েছে।

এক কর্মকর্তা বলেন, 'ইসি কিছুটা চাপের মধ্যে রয়েছে। প্রচারণার সময় আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করা আমাদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে।'

পোস্টাল ব্যালটে ভোটের পদ্ধতি ও সার্বিক ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে আজ মঙ্গলবার সব রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে বসছে নির্বাচন কমিশন।

জামায়াত ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন করছে: বিএনপি

গতকাল যোগাযোগ করা হলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, 'বিভিন্ন ঘটনায় আমরা দেখছি, কোনো একটি রাজনৈতিক দল চাপ সৃষ্টি করলে নির্বাচন কমিশন পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে পড়ছে বলে মনে হয়। আমরা আহ্বান জানাই, যেন এমনটি না ঘটে, কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে কেউ যেন প্রশ্ন তুলতে না পারে।'

তিনি আরও বলেন, 'আমাদের প্রত্যাশা, নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষভাবে কাজ করবে। আমরা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন চাই, যেন কেউ এই নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলতে না পারে।'

এর আগে রবিবার আগারগাঁওয়ে ইসি কার্যালয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের সাথে দেখা করার পর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অভিযোগ করেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের দলীয় প্রধানসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা প্রতিনিয়ত আচরণবিধি ভঙ্গ করে দলীয় প্রচারণা চালাচ্ছে। 

তিনি আরও অভিযোগ করেন, বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকায় রিটার্নিং অফিসার, সহকারী রিটার্নিং অফিসার, পুলিশ সুপার, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ অন্যান্য কর্মকর্তাদের একটি অংশ 'একটি দলে'র পক্ষে কাজ করছে।

তিনি ইসির বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি বিষয়ে সন্দেহজনক আচরণের অভিযোগও তোলেন। এর মধ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের পোস্টাল ব্যালটই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং অমীমাংসিত বিষয়।

ফখরুল আরও অভিযোগ করেন, জামায়াতের নির্বাচনী কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে এনআইডির কপি, বিকাশ নম্বর, মুঠোফোন নম্বর সংগ্রহ করছে, যা ব্যক্তিগত গোপনীয়তার লঙ্ঘন, ক্রিমিনাল অফেন্স।
 
তিনি দাবি করেন,  ঢাকা মহানগরী এলাকার বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকায় একটি রাজনৈতিক দল তাদের প্রার্থীদের বিজয়ী করার অনৈতিক কূটকৌশল হিসেবে দেশের ভিন্ন ভিন্ন এলাকা থেকে ভোটারদের ব্যাপক হারে এলাকা পরিবর্তন করাচ্ছে।

বিএনপি ভোটারদের বিভ্রান্ত করছে: জামায়াত

গতকাল ডেইলি স্টারের সঙ্গে আলাপকালে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার বিভাগের প্রধান আহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, 'মূল কথা হলো নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে আমরা যে ধরনের নিরপেক্ষ আচরণ আশা করি, তা আমরা দেখতে পাচ্ছি না। কমিশনের মধ্যেই কিছু কর্মকর্তা আছেন যারা একটি নির্দিষ্ট দলের দিকে ঝুঁকে আছেন বলে মনে হচ্ছে, যা তাদের কিছুটা সুবিধা দিচ্ছে।'

এর আগে, রোববার প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে দেখা করার পর জামাতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, দলটি অধ্যাপক ইউনূসকে জানিয়েছে যে মাঠপর্যায়ে কিছু এসপি এবং ডিসিদের আচরণ 'পক্ষপাতদুষ্ট' বলে মনে হচ্ছে।

'একটি দলের প্রধানকে নিরাপত্তা কিংবা প্রটোকল দেওয়া হচ্ছে। একটি দলকে এমন প্রটোকল দিলে সমস্যা নেই। তবে জামায়াতের আমিরকেও একইভাবে প্রটোকল এবং নিরাপত্তা দিতে হবে।'
 
তাহের বলেন, বিএনপি ভোটারদের কাছে গিয়ে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড দিচ্ছে। আসলে এ দুটোই অর্থনীতির কিছু নয়, এটা কেবল ধোঁকাবাজি। 

ইসি পক্ষপাতদুষ্ট: এনসিপি

গতকাল প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠককালে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম নির্বাচন-সম্পর্কিত বেশ কয়েকটি বিষয়ের প্রতি তার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং সমান সুযোগ নিশ্চিত করার জন্য সরকারকে সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানান।

বৈঠকের পর এনসিপির মুখপাত্র এবং নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া সাংবাদিকদের বলেন, আগের বিতর্কিত নির্বাচনগুলোর মতো একই কায়দায় মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের একতরফা ও পক্ষপাতমূলক আচরণ কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। 

নাহিদ ও নাসীরউদ্দীন পাটওয়ারীকে দেওয়া শোকজ নোটিশের প্রতিবাদ জানিয়ে আসিফ মাহমুদ বলেন, প্রচারণায় ব্যবহৃত আলোকচিত্রগুলো ছিল গণভোটের প্রচারণারই উপকরণ, যা আরপিও বা আচরণবিধি অনুযায়ী কোনো অপরাধ বা শাস্তিযোগ্য লঙ্ঘন নয়।

তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, সারা দেশে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা পোস্টার, বিলবোর্ড এবং ফেস্টুনে প্রকাশ্যে নির্বাচনী প্রতীক, দলীয় নাম এবং নেতাদের ছবি ব্যবহার করছেন, যা আচরণবিধির স্পষ্ট লঙ্ঘন।

'যখন প্রচারণা নিষিদ্ধ ছিল, তখন পুরো ঢাকা শহর ও দেশ একটি দলের চেয়ারপারসনের পোস্টারে ভরে গিয়েছিল,' বলেও উল্লেখ করেন আসিফ।

তিনি আরও দাবি করেন, রোববার আপিল নিষ্পত্তির সময় কমিশন সাংবিধানিক বিধান এবং আরপিওসহ বেশ কয়েকটি বিদ্যমান আইন লঙ্ঘন করে দ্বৈত নাগরিকত্বের প্রার্থীদের বৈধতা দিয়েছে।

ইসিকে অবশ্যই ব্যবস্থা নিতে হবে, বলছেন বিশেষজ্ঞরা

নির্বাচন বিশেষজ্ঞ আবদুল আলীম ও জেসমিন টুলি বলেছেন, বিভ্রান্তি দূর করার জন্য কমিশনের উচিত বিলম্ব না করে নির্দিষ্ট অভিযোগ তদন্ত করা।

'কিন্তু আমি এখন পর্যন্ত শুনিনি যে নির্বাচন কমিশন এসব অভিযোগে কোনো অনুসন্ধান বা তদন্ত চালাচ্ছে। যদি নির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ থাকে, কমিশনকে তাৎক্ষণিকভাবে জানানো উচিত, তারা কী ব্যবস্থা নিয়েছে বা অভিযোগটি সত্য না মিথ্যা। তাতেই জনগণ বুঝতে পারবে যে কমিশন সত্যিই পদক্ষেপ নিচ্ছে,' বলেন সাবেক ইসি কর্মকর্তা টুলি।

আলীম বলেন, কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করার জন্য দলগুলো সাধারণত ভোটের আগে পক্ষপাত এবং নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগ করে।

'তবে অতীতে তত্ত্বাবধায়ক বা অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর কমিশনের সামনে অভিযোগ এবং পাল্টা অভিযোগ তোলা এবং একযোগে বিক্ষোভ দেখাতে আমরা দেখিনি,' বলেন তিনি।

দুই দিনের মধ্যে আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হচ্ছে। তিনি সতর্ক করেন, পরিস্থিতি যদি এমন থাকে থাকে, তবে এটি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে উঠবে।

তিনি বলেন, 'তাই ইসির উচিত অভিযোগগুলো তদন্ত করা এবং কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। ভুল কোথায় হয়েছে তা জনগণের কাছে প্রকাশ করতে হবে।'
 
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, পক্ষপাত এবং সমান লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের অভাব সম্পর্কিত অভিযোগগুলো রাজনৈতিক কৌশলের অংশ।

'আমরা কারো প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট নই। আমরা অবাধ, সুষ্ঠু এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ,' বলেন তিনি।