Tuesday, Jan 20, 2026 28°C

Concise and comprehensive global coverage.

General

জনশক্তি রপ্তানিতে নতুন ২৫২ এজেন্সির অনুমোদন, বাড়ছে উদ্বেগ

জনশক্তি রপ্তানি খাতে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার লাগাম টানার পরামর্শ থাকলেও সরকার নতুন করে আরও ২৫২টি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স দিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে দেশে মোট বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬৪৬টিতে, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ।প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের তত্ত্বাবধানে এই অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা এ নিয়ে সতর্ক করেছেন। তারা বলছেন, অনিয়ম ও দুর্বল তদারকির কারণে এই খাত আগে থেকেই ধুঁকছে। এখন নতুন করে এজেন্সির অনুমোদন দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে...

NP
Published: January 20, 2026, 08:04 AM
জনশক্তি রপ্তানিতে নতুন ২৫২ এজেন্সির অনুমোদন, বাড়ছে উদ্বেগ

জনশক্তি রপ্তানি খাতে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার লাগাম টানার পরামর্শ থাকলেও সরকার নতুন করে আরও ২৫২টি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স দিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে দেশে মোট বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬৪৬টিতে, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ।

প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের তত্ত্বাবধানে এই অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা এ নিয়ে সতর্ক করেছেন। তারা বলছেন, অনিয়ম ও দুর্বল তদারকির কারণে এই খাত আগে থেকেই ধুঁকছে। এখন নতুন করে এজেন্সির অনুমোদন দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে।

গত বছরের ডিসেম্বরে সরকার গঠিত কমিটির দেওয়া অর্থনীতির শ্বেতপত্রে সুনির্দিষ্ট কিছু সুপারিশ করা হয়েছিল। সেখানে কর্মীদের জিম্মি করে টাকা আদায় ও আর্থিক অনিয়ম বন্ধে রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যা 'যৌক্তিক পর্যায়ে' কমিয়ে আনার কথা বলা হয়। কিন্তু নতুন সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে সেই সুপারিশ সরাসরি উপেক্ষা করা হয়েছে।

শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রধান ও অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, 'পুরোনো অনেক এজেন্সি অযোগ্য। এদের অনেকেই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। আমরা তাদের পুনরায় নিবন্ধনের মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করার পরামর্শ দিয়েছিলাম।

তিনি বলেন, পুরোনো জঞ্জাল পরিষ্কার না করে উল্টো নতুন এজেন্সির সংখ্যা বাড়ানোয় আমি বিস্মিত। এর ফলে পুরো ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা তৈরির আশঙ্কা রয়েছে। এই দায় সরকারকে নিতে হবে।

শ্বেতপত্রের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মীদের বিদেশে যাওয়ার খরচ সবচেয়ে বেশি। গত এক দশকে দালালদের অগ্রিম টাকা দিয়েও ১৯ শতাংশ কর্মী বিদেশে যেতে পারেননি। এর ফলে বছরে প্রায় ৩১ হাজার ৬৬০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য প্রবাসীকল্যাণ উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। মেসেজ পাঠানো হলেও কোনো জবাব দেননি তিনি।

তবে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব নিয়ামত উল্লাহ ভূঁইয়া বলেন, এজেন্সি বেশি হলে সিন্ডিকেটের কারসাজির সুযোগ কমে। প্রতিটি এজেন্সি একজন করে কর্মী পাঠালেও সংখ্যাটা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। এজেন্সিগুলো নৈতিকতার সঙ্গে মান বজায় রাখলে সংখ্যা বেশি হলেও সমস্যা নেই।

রিক্রুটিং এজেন্সির অনিয়ম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তাদের নিয়ন্ত্রণে আইনি ব্যবস্থা রয়েছে। অসৎ এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং কাউকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে না।

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য বলছে, রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে প্রতারণা ও জালিয়াতির অভিযোগ কমছে না। ২০২৪ সালে ২ হাজার ২১৩টি, ২০২৩ সালে ২ হাজার ৩৮০টি, ২০২২ সালে ১ হাজার ২৪০টি, ২০২১ সালে ৫৮২টি এবং ২০২০ সালে ৯০৫টি অভিযোগ জমা পড়েছে।

২০০৯ সালে দেশে রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যা ছিল ৯০০-এর মতো। এরপর থেকে তা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। গত বছরের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে এই সংখ্যা ২ হাজার ৩০০ ছাড়িয়েছিল। নতুন অনুমোদিত এজেন্সিগুলোর তালিকা গত বছরের ৪ নভেম্বর প্রকাশ করে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়।

বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে বেশি রিক্রুটিং এজেন্সি বাংলাদেশে। তুলনায় ভারতে ১ হাজার ৯৮৮, পাকিস্তানে ২ হাজার ৫৩৭, নেপালে ১ হাজার ৪১, শ্রীলঙ্কায় ৮৫৭ এবং ভুটানে ৩১টি এজেন্সি রয়েছে।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিস বা বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ফখরুল ইসলাম বলেন, নতুন রিক্রুটিং এজেন্সির অনুমোদনের ইতিবাচক ও নেতিবাচক—উভয় দিকই রয়েছে। ইতিবাচক দিক হলো, নতুন প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারি বিধি মেনে কাজ করার সুযোগ পাবে।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, বর্তমান শ্রমবাজারের পরিস্থিতি নাজুক। ফখরুল ইসলাম বলেন, নতুন শ্রমবাজার তৈরি না হলে নতুন এজেন্সিগুলো টিকে থাকতে পারবে না। এজেন্সি চালাতে প্রতিমাসে অনেক খরচ আছে।

ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, লাইসেন্স বাড়ালেই অভিবাসন ব্যয় বা কর্মীদের ভোগান্তি কমবে না। তিনি বলেন, 'আমি মনে করি না ২৫২টি নতুন লাইসেন্স এই খাতে উন্নতি ঘটাবে বা কর্মীদের কষ্ট কমাবে। এখানে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনাই আসল কথা।'

সংকটে শ্রমবাজার

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত বছর রেকর্ড ৩১ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। কিন্তু কর্মীদের বিদেশে পাঠানোর ব্যয় কমানো, দালালদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করা বা কর্মীদের অধিকার রক্ষায় তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি।

সৌদি আরব এখনো বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার। গত বছর বিদেশে যাওয়া ১১ লাখ ৩১ হাজার কর্মীর প্রায় ৭০ শতাংশই গেছেন সেখানে। তবে সেখানে আকামার (কাজের অনুমতিপত্র) খরচ বেড়েছে। কাজ পাওয়া নিয়েও সংকট রয়েছে বলে অভিযোগ করছেন কর্মীরা।

গত এক দশকে ওমান, বাহরাইন, লিবিয়া, সুদান, মিসর, রোমানিয়া ও ব্রুনেইসহ অনেক দেশ বাংলাদেশিদের জন্য শ্রমবাজার বন্ধ করে দিয়েছে। সিন্ডিকেট বাণিজ্যের অভিযোগে মালয়েশিয়াও কর্মী নেওয়া স্থগিত রেখেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের বাজার কাগজে-কলমে খোলা থাকলেও ২০২৪ সালের জুলাই থেকে বাংলাদেশি কর্মীদের ভিসা দেওয়া বন্ধ রয়েছে।

ইতিবাচক দিক হলো, ২০২৫ সালের মে মাসে জাপানের সঙ্গে দুটি চুক্তি করেছে বাংলাদেশ। এর আওতায় পাঁচ বছরে অন্তত ১ লাখ কর্মী নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে টোকিও। তবে গত বছর মাত্র ১ হাজার ৫৬৩ জন কর্মী জাপানে যেতে পেরেছেন। গত বছরের অক্টোবরে ইরাকের সঙ্গেও একটি চুক্তি হয়েছে। এর মাধ্যমে ২০২০ সাল থেকে বন্ধ থাকা শ্রমবাজার খোলার পথ তৈরি হয়েছে।

আইনি সুযোগ কমে আসায় অবৈধ পথে অভিবাসনের প্রবণতা বাড়ছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) ডিসপ্লেসমেন্ট ট্র্যাকিং ম্যাট্রিক্স অনুযায়ী, গত বছর সাগরপথে অবৈধভাবে ইউরোপে প্রবেশকারীদের তালিকায় বাংলাদেশিরা শীর্ষে ছিল। এ সময় ২২ হাজার ১৪৫ জন বাংলাদেশি অনিরাপদ পথে ইউরোপে ঢুকেছেন। আগের বছর এই সংখ্যা ছিল ১৫ হাজার ৩০৪ জন।

দালালদের ওপর নির্ভর করায় তরুণরা পাচারের শিকার হচ্ছেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের তথ্যমতে, ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত মানব পাচারের অভিযোগে ৪ হাজার ৫৪৬টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে ১৯ হাজার ২৮০ জনকে। এর মধ্যে সাজা হয়েছে ১৫৭ জনের।