Friday, Jan 16, 2026 28°C

Concise and comprehensive global coverage.

General

হারিয়ে যাচ্ছে সিলেটের ঢলু বাঁশের চুঙ্গাপুড়া পিঠা

সিলেট অঞ্চলের শতাব্দী প্রাচীন রন্ধন ঐতিহ্য চুঙ্গাপুড়া পিঠা আজ বিলুপ্তির মুখে। গ্রামবাংলার শীতকালীন রাতের অবিচ্ছেদ্য উৎসব—রাতভর খড়ের আগুন জ্বালিয়ে চুঙ্গাপুড়া পিঠা বানানোর দৃশ্য এখন প্রায় বিলুপ্ত।এক সময় শীত এলেই স্থানীয় হাটবাজারে বসত মাছের মেলা। রুই, কাতলা, চিতল, বোয়াল, পাবদা, কই ও মাগুরের মতো মাছ হাওর ও নদী থেকে ধরা বা মেলা থেকে কেনা হতো। এসব মাছ হালকা মশলায় ভেজে (স্থানীয় ভাষায় মাছ বিরান)  চুঙ্গাপুড়া পিঠার সঙ্গে পরিবেশন করা হতো। এটি ছিল সিলেট অঞ্চলের খাদ্যসংস্কৃতির এক অনন্য পরিচয়।স...

NP
Published: January 16, 2026, 05:07 PM
হারিয়ে যাচ্ছে সিলেটের ঢলু বাঁশের চুঙ্গাপুড়া পিঠা

সিলেট অঞ্চলের শতাব্দী প্রাচীন রন্ধন ঐতিহ্য চুঙ্গাপুড়া পিঠা আজ বিলুপ্তির মুখে। গ্রামবাংলার শীতকালীন রাতের অবিচ্ছেদ্য উৎসব—রাতভর খড়ের আগুন জ্বালিয়ে চুঙ্গাপুড়া পিঠা বানানোর দৃশ্য এখন প্রায় বিলুপ্ত।

এক সময় শীত এলেই স্থানীয় হাটবাজারে বসত মাছের মেলা। রুই, কাতলা, চিতল, বোয়াল, পাবদা, কই ও মাগুরের মতো মাছ হাওর ও নদী থেকে ধরা বা মেলা থেকে কেনা হতো। এসব মাছ হালকা মশলায় ভেজে (স্থানীয় ভাষায় মাছ বিরান)  চুঙ্গাপুড়া পিঠার সঙ্গে পরিবেশন করা হতো। এটি ছিল সিলেট অঞ্চলের খাদ্যসংস্কৃতির এক অনন্য পরিচয়।

সিলেটের ঐতিহ্য অনুযায়ী, কোনো অতিথি কিংবা নতুন জামাইকে চুঙ্গাপুড়া পিঠা, মাছের তরকারি ও নারকেল পিঠা না খাইয়ে বিদায় দেওয়া ছিল সামাজিকভাবে লজ্জাজনক। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই রীতিও হারিয়ে যাচ্ছে।

এই ঐতিহ্য বিলুপ্তির পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে প্রয়োজনীয় উপকরণের সংকট—বিশেষ করে ঢলু বাঁশের অভাব। এক সময় মৌলভীবাজারের বড়লেখার পাথারিয়া পাহাড়, জুড়ির লাঠি টিলা, রাজনগর, কমলগঞ্জ, চুঙ্গাবাড়ি, চা-বাগান ও আশপাশের পাহাড়ি এলাকায় এই প্রচুর বাঁশ পাওয়া যেত। বর্তমানে সেখানে বাঁশের প্রাপ্যতা মারাত্মকভাবে কমে গেছে।

স্থানীয় সাংবাদিক সালাউদ্দিন শুভ জানান, অবৈধভাবে পাহাড় কাটার কারণে ব্যাপকভাবে বন উজাড় হয়েছে। এর ফলে বাঁশবাগান প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে পড়েছে। বাজারে এখন এই বাঁশ বিরল এবং দামও চড়া।

বিশেষ এই ধরনের সরু বাঁশ ছাড়া চুঙ্গাপুড়া পিঠা তৈরি করা সম্ভব নয়। এই বাঁশে থাকা প্রাকৃতিক তৈলাক্ত উপাদান আগুনে বাঁশকে দ্রুত পুড়ে যেতে বাধা দেয়। বাঁশের ভেতরের উচ্চ আর্দ্রতার কারণে আগুনে দেওয়ার সময় বাঁশ পুড়ে যাওয়ার আগেই ভেতরের পিঠা সঠিকভাবে সেদ্ধ হয়। 

কোনো কোনো এলাকায় বাঁশের ভেতরে চাল, দুধ, চিনি, নারকেল ও চালের গুঁড়া মিশিয়ে এই পিঠা তৈরি করা হয়। রান্না শেষে পিঠা মোমবাতির মতো বাঁশ থেকে আলাদা হয়ে আসে। এই  পিঠা বানাতে প্রচুর পরিমাণে খড় পোড়াতে হয়।

কমলগঞ্জ উপজেলার মুন্সিবাজারে পিঠা তৈরির জন্য বাঁশ কিনতে আসা প্রণিত দেবনাথ বলেন, এখন আর এসব জিনিস সহজে পাওয়া যায় না। পৌষ সংক্রান্তির সময় খুব অল্প পরিমাণে বাঁশ পাওয়া যায়। ১০-১৫ বছর আগে সর্বত্র এই ঢলু বাঁশ ছিল, এখন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে। পরিবারের অনুরোধে বাঁশ কিনতে আমাকে একাধিক বাজার ঘুরতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত মুন্সিবাজারে অল্প কিছু ঢলু বাঁশ পেয়েছি।

কমলগঞ্জের লেখক ও কবি সাজ্জাদুল হক স্বপন বলেন, বাঁশের ভেতরে লুকিয়ে থাকে এক অনন্য স্বাদের খাবার। চুঙ্গাপুড়া পিঠা শুধু খাদ্য নয়, এটি সিলেটের একটি প্রাচীন ঐতিহ্য। কিন্তু ঢলু বাঁশ এখন অত্যন্ত দুর্লভ। একসময় যে ঐতিহ্য সমৃদ্ধ ছিল, তা আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে।