মাছ, গবাদিপশু ও জীববৈচিত্র্যের ওপর কীটনাশকের ক্ষতিকর প্রভাব কমাতে সাতটি হাওর জেলায় লক্ষ্যভিত্তিক একটি নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি চালু করছে সরকার।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের একটি অভ্যন্তরীণ নথি অনুযায়ী, সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া—এই সাতটি জেলাতেই দেশের অধিকাংশ হাওর জলাভূমি অবস্থিত। এসব এলাকায় ব্যাপকভাবে বোরো ধানের চাষ হয়।
পরিকল্পনার বিষয়টি নিশ্চিত করে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, বোরো মৌসুমে হাওর অঞ্চলে পরিবেশগত ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে বলেই এই এলাকাগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, সারা দেশে কীটনাশকের ব্যবহার প্রকৃত কৃষি চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি। এ কারণে একসঙ্গে দেশজুড়ে কঠোর নিয়ন্ত্রণ কার্যকর করা সম্ভব নয়। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য জেলাকেও এই কর্মসূচির আওতায় আনা হবে।
হাওর অঞ্চল থেকে দেশের উল্লেখযোগ্য অংশের বোরো ধান উৎপাদিত হয়, যা জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তার জন্য এলাকাটিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক (মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ) বরুণ চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, বোরো মৌসুমে অতিরিক্ত বা নিয়ন্ত্রণহীনভাবে কীটনাশক ব্যবহার করলে ধানে ক্ষতিকর রাসায়নিক অবশিষ্টাংশ থেকে যেতে পারে, যা ভবিষ্যতে মাছ ও মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
বর্ষা মৌসুমে হাওর পানিতে পূর্ণ হয়ে বিস্তৃত জলাভূমিতে পরিণত হয়—যেখানে দেখা যায় মাছের অবাধ বিচরণ। শুষ্ক মৌসুমে একই জমিতে ধান চাষ ও গবাদিপশু চরানো হয়।
তবে বরুণ চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ক্ষেত থেকে ধুয়ে কীটনাশক পানিতে চলে যাওয়াই এখন বড় উদ্বেগের কারণ।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রয়োগ করা কীটনাশকের প্রায় ২৫ শতাংশ বৃষ্টির পানির সঙ্গে পাশের উন্মুক্ত জলাশয়ে চলে যায় এবং আনুমানিক ১৫ থেকে ২০ শতাংশ অবশিষ্টাংশ হিসেবে থেকে যায়।
তিনি আরও বলেন, হাওরের পরিবেশের জন্য এর প্রভাব বিশেষভাবে গুরুতর, কারণ এখানেই দেশের প্রায় ২২ শতাংশ গবাদিপশু ও ২৪ শতাংশ হাঁসের বসবাস। পাশাপাশি সাতটি হাওরপ্রধান জেলা থেকে দেশের মোট মাছ উৎপাদনের প্রায় ৩০ শতাংশ আসে হাওরের জলাভূমি থেকে।
হাওরে মাছ উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমে যাওয়ার পাশাপাশি প্রজাতি বিলুপ্তির আশঙ্কা বাড়তে থাকায় এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই) ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, প্লাবিত হাওর এলাকায় মাছ আহরণ ২০১১–১২ অর্থবছরে প্রায় ২ লাখ ৩১ হাজার টন থাকলেও ২০২৩–২৪ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ২৮ হাজার টনে। অর্থাৎ এক দশকের কিছু বেশি সময়ে উৎপাদন কমেছে ১ লাখ ৩ হাজার টনেরও বেশি।
এই উৎপাদন কমে যাওয়ার সঙ্গে সারা দেশে কীটনাশক ব্যবহারের বৃদ্ধিও ঘটেছে। বাংলাদেশ ক্রপ প্রোটেকশন অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে কীটনাশক ব্যবহার ছিল ৩৩ হাজার ৩৭০ টন, যা ২০২১ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৩৯ হাজার ৫৪০ টনে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, হাওরের জলাভূমিতে জীববৈচিত্র্য হ্রাস ইতোমধ্যেই উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।
বিএফআরআইয়ের জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শওকত আহমেদ ডেইলি স্টারকে বলেন, একসময় হাওর অঞ্চলে প্রায় ১৩৩ প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত, কিন্তু বর্তমানে অনেক প্রজাতিই বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে।
সংকটাপন্ন প্রজাতির মধ্যে রয়েছে বাঘা আইড়, চেনুয়া ও ভাঙন বাটা। বিপন্ন তালিকায় আছে পাবদা, চিতল, রিটা, গজার ও ককশা বয়রালি। আর চাপিলা, ফলি, বোয়াল, তিতপুঁটি, গুঁজি আইড় ও কুচিয়া ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত।
শওকত আহমেদ বলেন, প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট—উভয় কারণই দীর্ঘমেয়াদে মাছ উৎপাদন হ্রাসের জন্য দায়ী।
উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মাটির স্বাস্থ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ব্যাঙ, কেঁচো, পোকামাকড় ও অণুজীবের মতো উপকারী জীব দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে।
তিনি বলেন, কৃষিজমি থেকে রাসায়নিক পদার্থ হাওর ও অন্যান্য জলাশয়ে প্রবাহিত হয়ে বিষাক্ততা তৈরি করছে, যা মাছ ও জলজ প্রাণীকে হত্যা করছে, প্রজনন ব্যাহত করছে এবং পুরো প্রতিবেশব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
নতুন কর্মসূচির আওতায় জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কমিটির মাধ্যমে কীটনাশক প্রয়োগে আরও কঠোর নজরদারি আরোপের পরিকল্পনা করেছে সরকার।
মন্ত্রণালয়ের নথিতে বলা হয়েছে, কীটনাশকের পাত্রে বাংলায় স্পষ্ট ব্যবহারবিধি উল্লেখ বাধ্যতামূলক করা হবে। পাশাপাশি হাওরপ্রধান এলাকায় কৃষকদের জন্য প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হবে।
কর্মকর্তারা জানান, কীটনাশক ব্যবহারের বিষয়ে বিদ্যমান বিধিমালায় অবশিষ্টকাল বা রেসিডু পিরিয়ড সম্পর্কিত নিয়ম রয়েছে—অর্থাৎ নিরাপদে ফসল কাটার আগে নির্ধারিত অপেক্ষার সময় মানতে হয়।
বাস্তবে অবশ্য সচেতনতার অভাবে অনেক কৃষক এসব নির্দেশনা মানেন না এবং কখনো কখনো কীটনাশক প্রয়োগের দিনই ফসল কেটে বাজারজাত করেন।
বিএফআরআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের ওই সাতটি জেলার ৪৭টি উপজেলায় মোট ৩৭৩টি হাওর রয়েছে, যার মোট আয়তন প্রায় ২ লাখ ৬৩ হাজার হেক্টর।