Sunday, Feb 8, 2026 28°C

Concise and comprehensive global coverage.

Politics

ডিজিটাল উসকানি ও মব ভায়োলেন্স: প্রবাসে বসে যেভাবে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে বাংলাদেশের রাজপথ

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রবাসে থাকা দুই ইনফ্লুয়েন্সার ইলিয়াস হোসেন ও পিনাকী ভট্টাচার্যের ডিজিটাল উসকানিতে বাংলাদেশের শীর্ষ দুটি গণমাধ্যম কার্যালয়ে ভয়াবহ মব হামলা চালানো হয়। সোশ্যাল মিডিয়া অ্যালগরিদম ব্যবহার করে তারা বছরের পর বছর ধরে ঘৃণ্য প্রচারণা চালিয়ে একটি বড় ডিজিটাল বাহিনী তৈরি করেছেন। সরকারের নিষ্ক্রিয়তা এবং প্ল্যাটফর্মগুলোর মডারেশন ব্যর্থতা এই সহিংসতাকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে গেছে, যা আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের আগে গণতন্ত্রের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

NP
Published: February 08, 2026, 06:06 AM
ডিজিটাল উসকানি ও মব ভায়োলেন্স: প্রবাসে বসে যেভাবে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে বাংলাদেশের রাজপথ

২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর রাতে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে বসবাসরত অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ইলিয়াস হোসেনের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে একটি পোস্ট দেওয়া হয়। সাত শব্দের সেই পোস্টে লেখা ছিল— ‘প্রথম আলোর একটা ইটও যেন না থাকে।’

ফেসবুকের ব্লু-টিক সম্বলিত পেজ থেকে দেওয়া এই পোস্ট মুহূর্তেই তাঁর ২২ লাখ অনুসারীর কাছে পৌঁছে যায় এবং হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রামসহ অন্যান্য ফেসবুক পেজে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এই বার্তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ‘প্রথম আলো’র ঢাকা কার্যালয়ের সামনে উচ্ছৃঙ্খল জনতা (মব) জড়ো হতে থাকে। গভীর রাত নাগাদ ভবনটিতে তাণ্ডব চালানো হয়।

যিনি এই নির্দেশ দিয়েছিলেন, তিনি তখন ৭ হাজার ৮০০ মাইল (প্রায় ১২ হাজার ৫৫৩ কিলোমিটার) দূরে নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসে অবস্থান করছিলেন। সম্ভবত উবার চালানোর বিরতির ফাঁকে তিনি এই পোস্টটি দেন।

তবে সংঘবদ্ধ জনতার এই সহিংসতা (মব সহিংসতা) কোনো স্বতঃস্ফূর্ত ঘটনা ছিল না। আর ইলিয়াস হোসেন একাও ছিলেন না। চার হাজার মাইল (৬ হাজার ৪৩৭ কিলোমিটার) দূরে প্যারিসে বসে তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী পিনাকী ভট্টাচার্য গত এক বছর ধরে ঠিক এই মুহূর্তটির জন্য মাঠ প্রস্তুত করছিলেন। এই দুই প্রবাসী ইনফ্লুয়েন্সার যৌথভাবে বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমগুলোর বিরুদ্ধে টানা অনলাইন প্রচারণা চালিয়ে আসছিলেন। তাঁরা পরিকল্পিতভাবে এসব প্রতিষ্ঠানের গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট করার চেষ্টা করেছেন এবং সেগুলোকে জনগণের শত্রু হিসেবে চিত্রিত করেছেন।

ডিজিটাল উসকানির মাধ্যমে সুপরিকল্পিতভাবে চালানো এই প্রচারণা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর আন্তঃদেশীয় সহিংসতা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে এক বিপজ্জনক সীমাবদ্ধতাকে সামনে এনেছে। পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে বসে ব্যক্তিবিশেষ ভঙ্গুর রাষ্ট্রগুলোতে প্রায় বিনা বিচারে মব সহিংসতা সংগঠিত করতে পারছেন, অথচ স্বাগতিক দেশ বা এসব প্ল্যাটফর্মের কোম্পানিগুলো এর কোনো দায় নিচ্ছে না।

প্রথম আলোতে হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইলিয়াস হোসেন উচ্ছৃঙ্খল জনতাকে বাংলাদেশের আরেক প্রধান সংবাদপত্র ‘দ্য ডেইলি স্টার’ কার্যালয়ে যেতে বলেন।

ভবনটি ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে গেলে ভেতরে আটকা পড়া সাংবাদিকেরা ফেসবুকে আকুতি জানিয়ে পোস্ট দিচ্ছিলেন। সাংবাদিক জায়মা ইসলাম লেখেন, ‘আমি আর শ্বাস নিতে পারছি না। প্রচুর ধোঁয়া। আমি ভেতরে আটকা পড়েছি। আপনারা আমাকে মেরে ফেলছেন।’

গভীর রাতে সেনাবাহিনীর সহায়তায় সাংবাদিকদের উদ্ধারের কয়েক ঘণ্টা পর ইলিয়াস হোসেন পোস্ট করেন, ‘ডেইলি স্টার ডান, ওয়েল ডান বয়েজ!’ এই পোস্টে ৮৪ হাজারের বেশি রিঅ্যাকশন পড়ে।

প্রযুক্তিনির্ভর সহিংসতার কাঠামো

ইলিয়াস হোসেন ও পিনাকী ভট্টাচার্য কার্যত রিমোট-কন্ট্রোলড বা দূরনিয়ন্ত্রিত একটি মব সহিংসতার কাঠামো তৈরি করেছেন, যার চালিকাশক্তি মূলত মেটার প্ল্যাটফর্মগুলো এবং ইউটিউবের ‘রেকমেন্ডেশন অ্যালগরিদম’। ফেসবুক ও ইউটিউব মিলিয়ে তাঁদের প্রায় দেড় কোটি অনুসারী রয়েছে, যে ডিজিটাল বাহিনী বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি শহরের মোট জনসংখ্যার চেয়েও বেশি।

ইলিয়াস হোসেন চারটি ফেসবুক পেজ চালান, যার সবগুলো মিলিয়ে অনুসারীর সংখ্যা ৩৫ লাখের বেশি। পাশাপাশি তাঁর ইউটিউব চ্যানেলের সাবস্ক্রাইবার সংখ্যা ৪৭ লাখ ৮০ হাজার। অন্যদিকে, পিনাকী ভট্টাচার্যের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে ২৯ লাখ অনুসারী আর ইউটিউব চ্যানেলে আরও ৪১ লাখ সাবস্ক্রাইবার রয়েছে।

গুগলের ট্রান্সপারেন্সি টুল ‘ডিকোড’ ব্যবহার করে দেখা গেছে, ২০২২ সালের আগস্টে ‘সীমানা টিভি ২৪’ নামে একটি ইউটিউব চ্যানেল খোলা হয়। ১ লাখ ৭৬ হাজারের বেশি সাবস্ক্রাইবার থাকা এই চ্যানেলে প্রায় একচেটিয়াভাবে পিনাকী ভট্টাচার্যের কন্টেন্ট প্রচার করা হয়। ভিডিওতে প্রদর্শিত বিজ্ঞাপন থেকে এই চ্যানেলটি আয় করে থাকে। যদিও পিনাকী ভট্টাচার্য বারবার দাবি করেছেন, ইউটিউব থেকে তাঁর অর্থের প্রয়োজন নেই এবং তিনি তাঁর অনুসারী গোষ্ঠীকে ‘ক্ষমতাহীনের ক্ষমতা’ হিসেবে ব্যবহার করেন।

এক বছরেরও বেশি সময় ধরে পিনাকী ও ইলিয়াস প্রথম আলো এবং দ্য ডেইলি স্টারের বিরুদ্ধে সমান্তরালভাবে একই ধরনের প্রচারণা চালিয়েছেন। ফেসবুক পোস্ট, লাইভস্ট্রিমিং (সরাসরি সম্প্রচার) এবং ইউটিউব ভিডিওর মাধ্যমে তাঁরা এই পত্রিকা দুটিকে ভারতপন্থী, ইসলামবিদ্বেষী এবং আলেমদের ওপর সহিংসতার সহযোগী হিসেবে অভিযুক্ত করেছেন। কোনো প্রমাণ ছাড়াই তাঁরা দুজনেই বারবার অভিযোগ তুলেছেন, এই সংবাদমাধ্যমগুলো ভারতের বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে কাজ করে।

এসব দাবি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে অবিশ্বাস ও ক্ষোভের একটি বলয় তৈরি করেছে।

পোস্ট থেকে রাজপথ

গত ১২ ডিসেম্বর তরুণ রাজনৈতিক কর্মী শরীফ ওসমান বিন হাদি মাথায় গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর থেকেই ঢাকা উত্তপ্ত ছিল। ওসমান হাদি পরবর্তীতে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা তাঁর ওপর এই হামলা চালিয়েছিল। ২০২৪ সালের আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে যান।

গত ১৮ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় ওসমান হাদির মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। বিচারের দাবিতে শাহবাগ মোড়ে হাজারো মানুষ জড়ো হতে থাকেন।

ঠিক তখনই এই সম্মিলিত শোককে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই ইলিয়াস হোসেন তাঁর সেই ‘একটি ইটও যেন না থাকে’ সংবলিত পোস্টটি দেন। একই ধরনের আহ্বান জানানো হয় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা এবং অন্যান্য ইসলামপন্থী অ্যাক্টিভিস্টদের পক্ষ থেকেও। তবে ইলিয়াস হোসেনের প্রচারণার প্রভাব ছিল সবার চেয়ে বেশি।

রাত সাড়ে ১০টার মধ্যে প্রথম আলো কার্যালয়ের বাইরে বড়োসড়ো একটি জমায়েত তৈরি হয়। রাত ১১টার দিকে শুরু হয় ভাঙচুর। ইলিয়াস হোসেন তখন একের পর এক পোস্ট করে যাচ্ছিলেন এবং একজন পরিচালকের মতো সহিংসতার দিক–নির্দেশনা দিচ্ছিলেন।

প্রথম আলোতে হামলার পর ইলিয়াস উচ্ছৃঙ্খল জনতাকে নতুন লক্ষ্য বাতলে দেন। ‘এ দেশে ভারতের আস্তানা থাকতে দেওয়া হবে না’—এমন ঘোষণা দিয়ে তিনি শাহবাগে অবস্থানরতদের দ্য ডেইলি স্টার কার্যালয়ের দিকে যাওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর সেই পোস্টটি দেড় হাজারেরও বেশিবার শেয়ার হয়।

এই ভাঙচুরের ঘটনা সংবাদমাধ্যম ছাড়িয়ে দেশের সুপরিচিত সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছায়ানট ও উদীচী এবং বেশ কিছু ভারতীয় স্থাপনা পর্যন্ত গড়ায়।

হামলার পরদিন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম এক ফেসবুক পোস্টে লেখেন, প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারের সাংবাদিকদের কাছ থেকে ‘সাহায্যের জন্য আর্তনাদ ও কান্নাজড়িত কণ্ঠে ফোন’ পাওয়ার পর তিনি ‘সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অসংখ্যবার ফোন করে সাহায্য পাঠানোর চেষ্টা’ করলেও তা সময়মতো পৌঁছাতে পারেনি। তিনি এই ঘটনাকে ‘দেশের ইতিহাসে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে অন্যতম ভয়াবহ মব আক্রমণ ও অগ্নিসংযোগ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

শফিকুল আলম লেখেন, ‘সব বন্ধুদের কাছে আমি গভীরভাবে দুঃখিত যে কিছু করতে পারিনি। আমি যদি একটি গর্ত খুঁড়ে লজ্জায় নিজেকে লুকিয়ে ফেলতে পারতাম।’ তবে এই কন্টেন্ট ক্রিয়েটররা কীভাবে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রায় বিনা বাধায় বাংলাদেশে এ ধরনের মব সহিংসতা উসকে দেওয়ার সুযোগ পেলেন, ‘ডিকোড’-এর এমন প্রশ্নের কোনো জবাব দেননি তিনি।

‘ডিকোড’ প্রতিক্রিয়া জানতে ইলিয়াস হোসেন ও পিনাকী ভট্টাচার্যকে ইমেইল করেছে। তাঁরা সাড়া দিলে প্রতিবেদনটি হালনাগাদ করা হবে।